Floating Facebook Widget

ঘুষ না নেয়াই বেশি লাভজনক কবে? - Deshi News

২৩ জানুয়ারি ২০১৯,বুধবার,দেশীনিউজ: মন্ত্রীদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিনি মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘কাজের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অন্যায় সহ্য করা হবে না। দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও অরাজকতা সহ্য করা হবে না। আপনারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। আপনাদের কেউই তদারকির বাইরে নন।’ এর আগে আমলাদের সঙ্গে বৈঠক, এমনকি দলের বিজয় সমাবেশেও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন।

গত দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারী, কর্মকর্তাদের বেতন বহুগুণ বাড়িয়ে তাদের জীবন রীতিমতো বিলাসী করে তুলেছেন। তবুও দুর্নীতি কমেনি। প্রশ্ন জাগছে, বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানো যায় কি না। মন্ত্রীরা বলছেন, শাসক দলের নানা স্তর থেকেও বলা হচ্ছে- এবারের সরকার অন্যরকম এক সরকার, যার প্রধান লক্ষ্য দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করা।

দুর্নীতি সত্যি কমবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই উচ্চারণ অব্যাহত থাকুক, আমাদের সরকারি অফিসগুলোতে কর্মসংস্কৃতি ফিরুক। দশটা-পাঁচটা অফিসে হাজিরা দেয়াই শুধু নয়, দক্ষতার সঙ্গে কর্ম সম্পাদিত হোক।

সরকারি অফিসে মানুষের অভিজ্ঞতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশ খারাপ। আর এ কারণেই একটা সাধারণ ধারণা এই যে, সরকারি দফতরে ‘ওয়ার্ক কালচার’ বা ‘কর্মসংস্কৃতি’ ভালো নয়। সত্যি বলতে কি, সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ কাজে খুব অবহেলা করেন, সিটে থাকেন না, অফিসে ব্যাগ রেখে বেরিয়ে যান ব্যক্তিগত কাজে, দীর্ঘদিন ফাইল আটকে রেখে অর্থ বাগিয়ে নেন, মানুষকে কোনো মর্যাদাই দিকে চান না, কাজে প্রচুর ভুল করেন, কিন্তু কোনো জবাবদিহিতা নেই। এগুলো সবই সত্যি, কিন্তু আবার পুরোটা নয়। প্রচুর কর্মকর্তা-কর্মচারী পাওয়া যাবে, যারা সময়মতো অফিস করেন, ঠিকঠাকমতো করেন, অর্থ লেনদেন করেন না এবং মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়ে থাকেন।

কিন্তু যখন খবর বের হয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ বিভাগের কর্মী মো. আফজাল হোসেনের মাসিক বেতন মাত্র ২৪ হাজার টাকা হলেও তিনি মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন, তখন মানুষ অন্যরকম ভাবনা ভাবতে বাধ্য হয়। আফজালের স্ত্রী রুবিনা একজন স্টেনোগ্রাফার। ২০ হাজার টাকার মতো মাসিক বেতন পেয়ে রাজধানী ঢাকায় বেশ কয়েকটি ভবনের মালিক। দুদকের দেয়া এই তথ্য মানুষ হজম করার আগেই আবার দুদক মারফতই জানতে পারলাম, ঢাকা পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) নির্বাহী প্রকৌশলী রমিজ উদ্দিনের নামে ঢাকায় পাঁচটি বাড়ি, গাজীপুরে ৩০ একর জমি এবং তার জন্মভূমি কুমিল্লাতে কয়েক একর জমি রয়েছে।

এই দুটি ঘটনাই মানুষকে চিন্তিত করে, কিন্তু অবাক করে না। কারণ মানুষ ধরেই নিয়েছে, এভাবেই সম্পদের স্তূপে বাস করেন সরকারি কর্মীরা। তাই আজ যখন দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে উচ্চারিত হচ্ছে, তখন আশা জাগলেও নিশ্চিত হওয়া যায় না যে সত্যিই দুর্নীতি কমবে। বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোয় এটি প্রায় অসম্ভব এক কাজ বলেই মনে হচ্ছে। দুর্নীতি ওপর মহল থেকে নিচের তলা পর্যন্ত বিস্তৃত। যারা দুর্নীতিগ্রস্ত নন, তারাও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল যেতে টেবিলের নিচে আর্থিক লেনদেন করতে হয়। এই সংস্কৃতিতে একজন সৎ কর্মচারী বিনা লেনদেনে ফাইল ছেড়ে দিলে তার কপালে দুর্ভোগ নেমে আসে, এটা আমরা জানি। এই সমস্যাগুলো সার্বিক প্রশাসনিক ও সেবা দক্ষতায় প্রভাব ফেলে।

আজ রাজনৈতিকভাবে সরকার যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাচ্ছে, তখন প্রথম কাজ হবে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেসব দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলবে, সেগুলোকে খোলা মনে গ্রহণ করা। তাদের যেন প্রতিপক্ষ মনে না করা হয়। কাজে ফাঁকি, দুর্নীতি, কাজের অভাব, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সরকার বলছে, দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে, সরকারই বা কাজের পরিবেশ তৈরিতে কতটা দায়বদ্ধ। অর্থাৎ কাজের ক্ষেত্রে সৎ কাজের জন্য পুরস্কার, অসৎ কাজের তিরস্কারটাও যেন সততার সঙ্গে হয়। যে ব্যবসায়ী প্রভাব খাটিয়ে কোনো খাতকে কলুষিত করার অপচেষ্টা করে, সে যেন দলীয় বা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা পদবি না পায়।

মানুষ বেশি হতাশ হয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুলিশ ও প্রশাসন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সমগোত্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এই ধরনের সেবার সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের কাজের তদারকি প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো কখন বলা চলে দুর্নীতি বেড়েছে? যদি অনেক বেশি লোক ঘুষ নেয়, নাকি যদি অনেক বেশি টাকা ঘুষ দিতে হয়? আমাদের দেশে লোকে ঘুষ দেয় যেন সুবিধামতো আইন ভাঙতে পারে। তাই মানুষের মন-মানসিকতার পরিবর্তনও প্রয়োজন। দুর্নীতি বলতে বুঝি টাকা নয় ছয়। কিন্তু সময়ের অপচয়ও একটা পরিমাপ। সরকারি কর্মীরা যদি গরহাজির থাকেন, যদি অকারণে কাউকে বহু দিন ঘোরান, তাও দুর্নীতি।

দুর্নীতির ইন্ধন ও আয়ত্ত দুই-ই আজ অনেকগুণ বেড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক নির্বাচনের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়াও দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। নির্বাচন কমিশন খরচের যে সীমা বেঁধে দেয়, সেটা কতজন মেনে চলেন? প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন, গাড়ির তেলের খরচ, তরুণদের প্রচারের কাজে নামাতে নগদ টাকা এবং অন্যান্য প্রলোভন, কোনো কিছুই বৈধ উপায়ে জোগাড় করার উপায় নেই। তাই রাজনীতিতে দুর্নীতি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিচারব্যবস্থার দশাও তাই মামলার পাহাড় জমে যাওয়ায় যে কোনো অভিযোগের ফয়সালা সহজে হয় না। এগুলো সবই দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করে।

প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করছেন। আমরা মনে করি, শাস্তি ছাড়াও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যেন ঘুষ খাওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং যেন ঘুষ না খাওয়াকেই ভালো বলে মনে হতে থাকে। কেবল নৈতিক বোধের কারণে নয়, নিজের স্বার্থরক্ষার বা সুবিধার জন্যও এমন একটা ব্যবস্থা আসুক যখন ভাবা হবে- ঘুষ না নেওয়াই বেশি লাভজনক। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও দুর্নীতি কমানোর একটা উপায়। ডিসক্রিশনারি অথরিটি বা অপরিমিত ক্ষমতাশালী সরকারি পদের মানুষের ক্ষমতার পরিসর কমালে দুর্নীতি কমবে সবচেয়ে বেশি।

দেশীনিউজ/শহিদ উল্লাহ বাবলু


অর্থ ও বাণিজ্য