Floating Facebook Widget

কতকাল ‘ঘরের বাঘ’ হয়ে থাকবে আবাহনী? - Deshi News

০৯ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার,দেশীনিউজ‘আবাহনী’ নামটি কত মানুষের হৃদয়েই না খোদাই করে লেখা। অতীতে ফিরে তাকালে এটি লাখো মানুষের ভালোবাসা আর আবেগের স্লোগান। এই প্রজন্মের কাছে ব্যাপারটি ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র গল্পের মতো শোনালেও আজও অনেকেই আবাহনীকে নিয়ে আবেগাপ্লুত হন, আবাহনীর সাফল্যে আনন্দিত হন, ব্যর্থতায় কষ্ট পান। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পশ্চিম গ্যালারিতে রোদ-ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজির হন। এই তো গত শুক্রবার প্রিমিয়ার লিগের অলিখিত ফাইনালে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের বিপক্ষে আবাহনী দুই গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর সব বাধা উপেক্ষা করে মাঠে নেমে পড়েছিলেন দর্শকেরা। আইনের চোখে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও ফুটবলে ‘হারিয়ে যাওয়া আবেগে’র কথা চিন্তা করেই হয়তো তাদের কেউ কিছু বলেনি। উল্টো মাঠের অনেকেই নস্টালজিক হয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু এই সমর্থকেরা শুধু ঘরোয়া ফুটবলেই আবাহনীর সাফল্য দেখতে দেখতে ‘ক্লান্ত’ হয়ে পড়েছেন। না হলে কি আর সেই বিজয় মিছিলের ভিড় থেকেও কানে আসে, ‘এইবার এএফসি কাপে আবাহনী কী করে দেখমু নে!’ 

খাতা কলমে দশ মৌসুম ধরে পেশাদার ফুটবলে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। প্রিমিয়ার লিগের দশ আসরের ছয়টিতেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে আবাহনী লিমিটেডই দেশের ফুটবলের রাজা। ঘরের মাঠে তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপ। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি আন্তর্জাতিক ফুটবল পা দিলেই ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। নামের পাশে লেগে গেছে ‘ঘরের বাঘ’ তকমা। যে বাঘ বিদেশে গেলেই শক্তি-তেজ হারিয়ে ফেলে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নদের ব্যর্থতার ফিরিস্তিটা অনেক লম্বা। যদিও আশির দশকের শেষে আর নব্বইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত আবাহনীর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এশীয় পর্যায়ে দুর্দান্ত সাফল্য পেয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার চ্যাম্পিয়ন দল এপ্রিল টুয়েন্টি ফাইভকে হারিয়েছিল। হারিয়েছিল এশীয় ফুটবলের শীর্ষ শক্তি ইরানের চ্যাম্পিয়ন পিরুজিকে। কাতারের আল সাদ, ইরানের ইশতেগলালের মতো দল কোনোমতে মান বাঁচিয়েছিল তাদের সঙ্গে। সাফ অঞ্চলের ক্লাবগুলি পাত্তাই পেত না মোহামেডানের সঙ্গে। বিরাট ব্যবধানে জয়ের রেকর্ডও আছে মোহামেডানের। ১৯৯৩ সালে মালদ্বীপের ভ্যালেন্সিয়া ক্লাবকে ৮-০ আর ১৯৯৬ লাওসের ইলেকট্রিসিটি ক্লাবকে একই ব্যবধানে হারিয়েছিল সাদা-কালোরা। 

সেই মোহামেডান তো এখন দূরের ইতিহাস। উল্টোদিকে আবাহনীর রেকর্ড খুবই খারাপ। মোহামেডানের ধারে-কাছেও নয়। সেই আশি-নব্বইয়ের রমরমা যুগেও আবাহনী এশিয়ান ক্লাব ফুটবলে বলার মতো কিছুই করতে পারেনি। এই যুগে তৃতীয় সারির টুর্নামেন্ট এএফসি প্রেসিডেন্ট কাপে পাঁচবার খেলে একবারও গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা। গত মৌসুমে এএফসি কাপে গ্রুপের চার দলের মধ্যে হয়েছে চতুর্থ। অর্থাৎ এএফসির ছয় আসরে টানা ব্যর্থ বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নরা। ঘরের মাঠেও আন্তর্জাতিক আসরে আবাহনী ভালো করেনি। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত শেখ কামাল ক্লাব কাপের দুই আসরেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে আবাহনী।

ঘরোয়া ফুটবলে দাপুটে আবাহনীর আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যর্থতার কারণ কি? প্রায় এক যুগ ধরে আবাহনীর জার্সিতে খেলা প্রাণতোষ দাস দায়ী করলেন অবহেলাকেই,‌ ‘এটা সত্য বাইরের টিমগুলো আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে। কিন্তু আমাদেরও অনেক দায় আছে। চার বিদেশির জায়গায় আমরা খেলি তিনজন নিয়ে। আন্তর্জাতিক আসর নিয়ে বাড়তি কোনো প্রস্তুতিও দেখা যায় না। বারবারের ব্যর্থতায় নিজেরাও ক্লান্ত বলে জানান তিনি।

ফুটবল পাড়ায় একটি কথা চালু আছে—আবাহনী মাগুরা গোল্ডকাপকে যতটা গুরুত্ব দেয় এএফসি কাপকে তেমন দেয় না। কথাটি প্রমাণের জন্য একটি তথ্যই যথেষ্ট, শেষ ছয় আসরে এশিয়ান কোটায় কোনো খেলোয়াড়ের নামই নিবন্ধন করেনি দলটি। এএফসির কোনো টুর্নামেন্টে ৪ জন বিদেশি খেলালে একজনকে অবশ্যই হতে হবে এশিয়ার কোনো দেশের। নয়তো তিনজন বিদেশি নিয়েই খেলতে হবে।

আবাহনী যে পারে, সেটির প্রমাণও কিন্তু আছে। গত মৌসুমেই ভারতের বেঙ্গালুরু এফসিকে দুর্দান্ত খেলেই ২-০ গোলে হারিয়েছিল আবাহনী। সে ম্যাচে রুবেল মিয়া করেছিলেন অবিশ্বাস্য এক গোল। ১০ জন নিয়ে সে ম্যাচে জিতে আবাহনী নিজেদের যোগ্যতার ঝলক দেখিয়েছিল। এই বেঙ্গালুরুই কিন্তু পরে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। 

এবার অতীত পেছনে ফেলে এএফসি কাপ নিয়ে আগেভাগেই কোমর বেঁধে নামতে চায় আবাহনী। প্রথমবারের মতো তারা নিতে চাচ্ছে এশিয়ান কোটার খেলোয়াড়, সঙ্গে নতুন বিদেশি কোচ। মার্চে এএফসি কাপের প্রথম ম্যাচে ঢাকায় মালদ্বীপের ক্লাব নিউ রেডিয়েন্টের বিপক্ষে খেলবে আবাহনী। অন্য দলগুলো হলো ভারতের চ্যাম্পিয়ন আইজল এফসি ও প্লেঅফে জয়ী হয়ে আসা একটি দল। 

আন্তর্জাতিক আসরে ব্যর্থতার মোড়ক থেকে বের হয়ে আসার এই তো সুযোগ। ঘরের মাঠে বাঘের তকমা ঝেড়ে ফেলে আবাহনী আন্তর্জাতিক ফুটবলে সফল হতে পারে কিনা, সেটাই দেখার অপেক্ষা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবাহনীর সাফল্যটা যে দেশের ফুটবলের জন্যই দরকার।

দেশীনিউজ/শফিকুল ইসলাম

খেলাধুলা