Floating Facebook Widget

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ বাংলাদেশি নিহত পরিবারে মাতম - Deshi News

০৮ জানুয়ারি ২০১৮,সোমবার,দেশীনিউজমর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় সৌদি আরবে ১০ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। জেদ্দা থেকে ৮শ’ কিলোমিটার দূরে ইয়েমেন সীমান্তের কাছে জিজান প্রদেশে শনিবার এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আরো ১০ জন বাংলাদেশি গুরুতর আহত হয়েছেন। রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। গতকাল দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বলা হয়, শনিবার স্থানীয়  সময় সকাল ৭টার দিকে একটি ট্রাকে করে ২০ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়েন।

তাদের বহনকারী ট্রাকের পেছন থেকে আরেকটি লরি ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৮ জন নিহত হন। বাকিদের আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে আরো দুজন মারা যান। সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে জিজান প্রদেশের ওই দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের বাড়ি বাড়ি শোকের মাতম চলছে। স্বজনরা মরদেহগুলো দ্রুত ফেরত নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন। আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নরসিংদীতে নিহতদের বাড়ি বাড়ি নিয়ে তাদের স্বজনদের আর্তনাদ-আহাজারি দেখেছেন এবং রিপোর্ট পাঠিয়েছেন।

ওদিকে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য জেদ্দা কনস্যুলেট থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মকর্তা প্রেরণ করা হয়েছে। পরিবারগুলো চাওয়া মতে, মরদেহ দেশে আনা কিংবা সৌদি আরবেই দাফনের ব্যবস্থা করার বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নিহত দু’জনের বাড়ি নরসিংদী, শোকে পাথর স্বজনরা: আমাদের নরসিংদী প্রতিনিধি মোর্শেদ শাহরিয়ার জানান, সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নয় বাংলাদেশির মধ্যে দুজনের বাড়ি নরসিংদীতে। এদের মধ্যে আমির হোসেনের বাড়ি নরসিংদীর সদর উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের বাউশিয়া গ্রামে। তবে ইদন নামে নরসিংদীর আরেকজন নিহতের নাম আসলেও তার ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে গতকাল সকালে সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আমির হোসেনের বাড়িতে গেলে দেখা যায় স্তব্ধ পরিবেশ। শোকে পাথর হয়ে আছে নিহতের পরিবার ও তার স্বজনরা। মুখে কান্না না থাকলেও চোখে ঝরছে অঝরধারা। পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি আমির হোসেনকে হারিয়ে তার পরিবার এখন দিশেহারা। 

সরকারের মাধ্যমে দ্রুত মৃতদেহ ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে পরিবার ও স্বজনরা। শেষবারের মতো তার চেহারা দেখতে চায় তারা। পাশাপাশি এই নিঃস্ব পরিবারের জন্য সরকারি সহযোগিতার দাবি জানিয়েছে নিহতের স্বজনরা। নিহত আমির হোসেনের স্ত্রী শাহেনা আক্তার বলেন, আমরা রাতে ফোন পেয়েছি। আমির হোসেন ৮ বছর বিদেশ করে আসছে। গত দুই বছর আগে দেশে এসে ছিল; এবারও আসার কাগজ জমা দিয়েছিল। কিন্তু তার আর আসা হলো না, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। দুই ছেলে, এক মেয়েকে নিয়ে আমি এখন কী করব। আমির হোসেনের ছেলে রবিউল্লা বলেন, আমার বাবা সৌদিতে মারা গেছে। আমরা এতিম হয়ে গেছি। মা ও ভাইবোন নিয়ে কী করে চলব। সরকার যদি আমাদের সাহায্য করে তাহলে আমরা চলতে পারব। আমির হোসেনের বড় ভাই মনির হোসেন বলেন, আমার ভাইটা সৌদিতে মারা গেছে। তার ছেলেমেয়েরা এতিম হয়ে গেল। আমির হোসেনের চাচাতো ভাই ছগির হাসান বলেন, সরকারের মাধ্যমে আমার ভাইয়ের লাশটা যেন তাড়াতাড়ি দেশে আসে। 

শেষবারের মতো তার লাশটা দেখতে পেতে পারি, তার পরিবার, সমাজ সবাই যেন তাকে দেখতে পারে। আমার চাচাতো ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা এতিম হয়ে গেল। এখন তারা কীভাবে সংসার চালাবে। তার আপন বড় ভাই সহজ-সরল সে নিজেই সংসার ঠিকমতো চলাতে পাওে না। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ তাদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য। উল্লেখ্য, নিহত আমির হোসেনসহ হতাহতদের বেশিরভাগ জিজান প্রদেশের আল ফাহাদ কোম্পানির পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন বলে জানা গেছে। 

সিরাজগঞ্জের দুলালের বাড়িতে শোকের মাতম: এদিকে আমাদের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের বালুকোল গ্রামে দুলাল মণ্ডল (৩২)। স্ত্রী-দুই সন্তান ও স্ত্রীর গর্ভে ৮ মাস বয়সী সন্তান রেখে ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে ঋণ করে প্রায় ১০ মাস আগে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস গত শনিবার ভোরে সৌদি আরবের ডিজান প্রদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় দুলালসহ আরও ১০ বাংলাদেশি নিহত হয়।  গত শনিবার দুপুর একটার পর দুলাল নিহত হয়েছেন এমন খবর সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের বালুকোল গ্রামের দুলালের বাড়িতে পৌঁছার পর থেকেই এই পরিবারে চলছে শোকের মাতম। 

স্ত্রী স্বপ্না নাবালক তিন সন্তানকে নিয়ে বারবার কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছেন। বয়োবৃদ্ধ বাবা আকবর মণ্ডল ও মা হাজেরা বেগম শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। মরদেহ কবে আসবে তাও তারা জানেন না। ছেলের মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে এবং নিজ হাতে কবর দেয়ার জন্য দ্রুত মরদেহ ফেরত আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন পরিবারের স্বজনরা। নিহত দুলালের চাচা মোস্তফা জানান, ৫ ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে দুলাল তৃতীয় সন্তান। বড় দুই ভাই মারা গেছেন। ছোট এক ভাই দুর্ঘটনায় পঙ্গু। আরেক ভাই প্রতিবন্ধী। এ অবস্থায় পরিবারে আর্থিক অস্বচ্ছলতা দূর করতে দুলাল ধারদেনা করে গত ১০ মাস ২২ দিন আগে সৌদি আরবে যায়। সেখানে জিজান প্রদেশের আল ফাহাদ কোম্পানির পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজে যোগ দেয়। গত শনিবার ভোরে কাজের যাবার সময় একটি সেনাবাহিনীর গাড়ির ধাক্কায় তাদের বহনকারী গাড়িটি খাদে পড়ে যায়। এতে দুলালসহ ১০ জন মারা যায়। 

ওই দিনই তার সহকর্মী বেলকুচির বাসিন্দা এক যুবক ফোন করে পরিবারকে বিষয়টি জানায়। এরপর থেকেই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়।  দুলালের বাবা আকবর মণ্ডল জানান, দুলালের ঘরে সায়েম (৯) সাব্বির (৫) বায়েজিদ (৫ মাস) নামে তিনটি নাবালক সন্তান রয়েছে। এদের মধ্যে দুলাল সৌদি আরবে যাবার সময় বায়েজিদ মায়ের গর্ভে ছিল। শিশু বায়েজিদ এখনো বাবার মুখ দেখেনি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আমার আরো দুই ছেলে স্টোক করে মারা গেছে। আরেক ছেলে প্রবাসে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলো। এ দুঃখ সহ্য করার মতো না। একজন পিতার কাছে ছেলে মৃত্যুর সংবাদ কত দুঃসহ তা বোঝাতে পারব না। মা হাজেরা বেগম জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ছেলে দুলাল মারা গেলো। এখনো ছেলে মরদেহ দেশে আসেনি। কবে-কখন আসবে তাও জানি না। তিনটি নাবালক শিশুকেও দেখার কেউ রইল না। সরকার যদি অনাথ শিশুদের প্রতি একটু দয়া করে তাহলে খুব খুশি হতাম। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কামরুন ন্নাহার সিদ্দীকা জানান, কামারখন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তথ্য পাবার পর মরদেহ ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরণ করা হবে। 

মরদেহ দ্রুত ফেরত চায় টাঙ্গাইলের আমিনের পরিবার: সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আমাদের স্টাফ রিপোর্টার, টাঙ্গাইল ও দেলদুয়ার প্রতিনিধি জানান, সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১০ জনের মধ্যে টাঙ্গাইলের দুই শ্রমিকের পরিচয় নিশ্চিত করেছে তাদের পরিবার। তারা হলেন দেলদুয়ার উপজেলার ডুবাইল গ্রামের আব্দুর রহিম মিয়ার ছেলে আমিন মিয়া (৩২) এবং অন্যজন হলেন কালিহাতী উপজেলার কস্তুরিপাড়া এলাকার হামেদ আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৩৫)। দুর্ঘটনার খবর জানার পর থেকেই নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দ্রুত মরদেহ ফিরে পাবার দাবি জানিয়েছে পরিবারগুলো। ডুবাইল গ্রামের নিহত আমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শোকের মাতম চলছে। ছেলেকে হারিয়ে মা বারবার বিলাপ করছেন আর জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। স্ত্রী হ্যাপিও শোকে পাথর। শোকার্ত পিতা আব্দুর রহিম জানান, প্রায় ৩ বছর আগে আমিন পাশের মির্জাপুর উপজেলার চুকুরিয়া গ্রামে বিয়ে করেন। 

অস্বচ্ছল সংসারের হাল ধরতে গত বছরের ১ নভেম্বর সাড়ে ৬ লাখ টাকা ধার-দেনা করে তাকে সৌদি আরবের আলফাতাহ বলদিয়া কোম্পানিতে পাঠানো হয়। শনিবার সন্ধ্যায় প্রতিবেশী আলমের মাধ্যমে জানতে পারি ওই সংবাদ।  দুই ভাইয়ের মধ্যে আমিন ছিল সবার বড়। তার মৃত্যুতে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে। একদিকে ঋণের বোঝা অপরদিকে পুত্র শোকে শোকার্ত পিতার আর্তনাতে ওই এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। 

দেশীনিউজ/এষার

প্রবাস