Floating Facebook Widget

ট্রাম্প কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়েই ছাড়বেন? - Deshi News

১১ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার,দেশীনিউজগত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে সামরিক অফিসার ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে ছবি তোলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মন্তব্য করেন, এখন যা দেখছেন তা হলো ঝড়ের আগে শান্ত অবস্থা। তিনি ঠিক কী বোঝাচ্ছেন, সে কথা অবশ্য খোলাসা করে বলেননি। এক দিন পর টুইটারে তিনি জানালেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে কোনো কাজ হবে না। ‘কাজ হবে শুধু এক পথে।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই হুমকি উপেক্ষা করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন জানিয়েছিলেন, উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে তাঁর দপ্তর উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে। নিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প টুইটারে বলেছিলেন, টিলারসন অকারণে তাঁর সময় নষ্ট করছেন। ‘আলাপ-আলোচনায় তোমার কর্মশক্তি নষ্ট করো না, যা করার আমরা তাই করব।’ এর আগে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতিসংঘে তাঁর প্রথম ভাষণে ট্রাম্প কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার ‘লিটল রকেটম্যান’ ও তাঁর সরকারকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।

সর্বশেষ মঙ্গলবার টিলারসনের সঙ্গে বিরোধটাকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসে ট্রাম্প তাঁকে বুদ্ধি বা বুদ্ধাঙ্কের (আইকিউ) পরীক্ষায় নামার চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘পরীক্ষার ফল কী হবে, তা আমি বলে দিতে পারি।’

ট্রাম্প কি সত্যি সত্যি পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পাঁয়তারা করছেন? প্রশ্নটি অবান্তর নয়। ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বহুজাতিক পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের কথাও ট্রাম্পের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। ট্রাম্পের নিজের দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা বব কর্কার নিউইয়র্ক টাইমস-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের প্রতি যেসব বেপরোয়া হুমকি দিচ্ছেন, তাতে যেকোনো সময় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেধে যেতে পারে। ‘তাঁর কথাবার্তায় আমি ভীত। আমি কেন, আমাদের দেশ নিয়ে ভাবে এমন যে কেউই এতে ভীত হবে।’ বলেছেন কর্কার।

হেঁজিপেঁজি লোক নন কর্কার। তিনি মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সভাপতি। ট্রাম্পের মতো তিনিও ভবন নির্মাণ ব্যবসায় পয়সা কামিয়ে কোটিপতি হয়েছেন। একসময় ভাবা হয়েছিল, ট্রাম্প কর্কারকেই ভাইস প্রেসিডেন্টের পদটি দেবেন। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য এই দুজনের সম্পর্কে বড় ধরনের চিড় ধরেছে। আগস্ট মাসে ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে কু ক্লাক্স ক্লান সমর্থকদের এক সহিংস সমাবেশের পর শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের পক্ষে সাফাই গেয়ে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেন, কর্কার তাতে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সে সময় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে সফল হতে হলে যে স্থিরতা ও যোগ্যতা দেখাতে হয়, ট্রাম্প তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। কর্কারের সে কথায় ট্রাম্প খেপে আগুন হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এই আগুনে নতুন করে ঘৃতাহুতি দিয়ে টাইমস-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কর্কার মন্তব্য করেন, ‘আমরা কেমন মানুষ নিয়ে কাজ করছি, আমাদের দলের অধিকাংশ সদস্যই সে কথা জানে।’

গত সপ্তাহে কর্কার জানান, ২০১৮ সালের পর তিনি আর সিনেট প্রার্থী হবেন না। সে কথার সূত্র ধরে ট্রাম্প টুইটারে জানান, কর্কার ভীরু, সে জন্য তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। ট্রাম্প দাবি করেন, আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অনুমোদন চেয়ে কর্কার তাঁর হাতে-পায়ে ধরেছেন। কথাটা মোটেই সত্য নয় বলে জানিয়েছেন কর্কারের একজন মুখপাত্র। উল্টো ট্রাম্প তাঁকে বার দুয়েক টেলিফোনে পুনরায় নির্বাচনে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। এক পাল্টা টুইটার বার্তায় কর্কার নিজে মন্তব্য করেন, কী লজ্জার ব্যাপার, হোয়াইট হাউস এখন বয়স্কদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র “ডে কেয়ার সেন্টার” হয়ে উঠেছে। এ কথার অর্থ, চিফ অব স্টাফ জেনারেল কেলি ‘বুড়োখোকা’ ট্রাম্পকে দেখেশুনে রাখছেন। ভিন্ন এক মন্তব্যে এর আগে কর্কার বলেছিলেন, জেনারেল কেলি ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল ম্যাটিস না থাকলে এত দিনে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যেত।

ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে শুধু কর্কার নন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসনও মন্তব্য করেছেন। একাধিক সূত্রে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে টিলারসন পদত্যাগে প্রস্তুত হয়েছিলেন। জেনারেল কেলির হস্তক্ষেপে তিনি সে কাজে বিরত হন। এনবিসি টিভি এমন কথাও জানায়, টিলারসন প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে ‘গর্দভ’ বলে গাল দেন। এ কথা চারদিকে চাউর হলে ট্রাম্প যথারীতি আগুন। পরে তাঁর চাপাচাপিতে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে টিলারসন বলতে বাধ্য হন, পদত্যাগের কথা তিনি মোটেই ভাবছেন না। তবে প্রেসিডেন্টকে তিনি ‘গর্দভ’ বলেছেন কি না, সে কথার সত্য-মিথ্যা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। এক অসমর্থিত খবরে বলা হয়েছে, টিলারসন, কেলি ও রাজস্বমন্ত্রী মিনুশিন নিজেদের মধ্যে এমন এক চুক্তি করেছেন যে তাঁদের একজন যদি পদত্যাগে বাধ্য হন, তো বাকি দুজনও পদত্যাগ করবেন।

টিলারসন নিজে ইঙ্গিত করেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি বছরখানেক থাকতে চান। তবে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা, টিলারসন সম্ভবত এই মাস শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করবেন। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হচ্ছে না, ট্রাম্প তাঁর কথায় কান দেন না। এ অবস্থায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিদেশি নেতাদের কাছে তাঁর কথার গুরুত্ব খুব সামান্যই।

শুধু কর্কার ও টিলারসন নন, ট্রাম্প তাঁর দলের আরও আধা ডজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের ব্যাপারে অপমানসূচক মন্তব্য করেছেন। সিনেটে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে হলে তাঁর নিজ দলের প্রত্যেক সদস্যের সমর্থন দরকার। এ অবস্থায় দলের নেতাদের খেপিয়ে তুলে ট্রাম্প নিজের সংসদীয় অ্যাজেন্ডা বিপদগ্রস্ত করছেন, এ ব্যাপারে সবাই একমত।

কর্কার নতুন আর কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না, সে কারণে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন বলে অনেকে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সে কথার হয়তো সত্যতা রয়েছে, কিন্তু না শোধরালে দলের আরও অনেকেই নিজেদের ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব রাখা শুরু করবেন, তাতেও কোনো ভুল নেই। এদিকে উত্তর কোরিয়া ও ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পের কথাবার্তায় যুদ্ধের আভাস পাওয়ায় দেশের ভেতরেও তাঁর ব্যাপারে অসন্তোষ বাড়ছে। এবিসির নেওয়া সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুসারে, ট্রাম্পকে সমর্থন করে এমন আমেরিকানের সংখ্যা মাত্র ৩২ শতাংশ। এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন পড়তির মুখে। গত আট মাসে তাঁদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৮০ শতাংশ থেকে কমে ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় রিপাবলিকান নেতারা, টিলারসনের ভাষায়, এমন একজন ‘গর্দভ’কে আর কত দিন সহ্য করেন, সেটাই দেখার বিষয়।

পড়তি জনমতের কথা ট্রাম্পও জানেন। বিশেষ কৌঁসুলি ম্যুলার গত নির্বাচনে রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারদলের আঁতাত নিয়ে তদন্তে যে হারে এগোচ্ছেন, ট্রাম্প সেদিকেও নজর দিচ্ছেন। শিগগিরই ট্রাম্পের প্রচারদলের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগনামা পেশ করবেন বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় বিপদ এড়াতে ও গা বাঁচাতে তিনি যদি সত্যি সত্যি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কোনো রকম সামরিক বিবাদে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে বিশ্ব যে এক মহাবিপর্যয়ে নিক্ষিপ্ত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিপদ এড়ানোর একমাত্র উপায়, ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার জেনিফার রুবেন লিখেছেন, ম্যুলারের তদন্ত দ্রুত শেষ করে আনা।

দেশীনিউজ /এনআর

বিশ্ব সংবাদ