Floating Facebook Widget

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে বিজিবি - Deshi News

২৮ আগস্ট ২০১৭,সোমবার,দেশীনিউজ: মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্বরতা ও সহিংসতা মাত্রা ছাড়িয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাবসতিতে ঢুকে নারী, শিশুদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলি করছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। নারীদের সম্ভ্রমহানি করছে। এ অবস্থায় দুই হাজারের অধিক রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ছোড়া অনেক গুলি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে পড়ছে। এতে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ দিকে সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে একটি গুলি পড়লে তার পাল্টাজবাব দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিজিবির মহাপরিচালক। 


কক্সবাজার (দক্ষিণ) থেকে গোলাম আজম খান জানান, মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্বরতা ও সহিংসতার মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা বসতিতে ঢুকে নারী-শিশুদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করছে। এতে হতাহত হচ্ছেন অনেকেই। এসব গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গা বিজিবির প্রতিরোধের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে কাতরাতে দেখা গেছে। সেই সাথে বালুখালী, রহমতের বিল, ধামনখালী, ঘুমধুম, তামব্রু, হোয়াইক্যংসহ বিভিন্ন সীমান্তে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিতে দেখা গেছে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে। ওপার থেকে ছোড়া গুলি এপারের জনপদে এসেও পড়ছে।

শনিবার বিকেল ৪টায় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ছোড়া বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি উখিয়ার বালুখালী ও রহমতের বিল গ্রামে এসে পড়ে। এতে কোনো বাংলাদেশী হতাহত না হলেও সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নেয় বলে জানান বালুখালী গ্রামের ইসলাম আহমদ ও রহমতের বিল এলাকার অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান। তিনি জানান, বিকেল ৪টার দিকে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারে সে দেশের সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখা যায়। এরপরই কানে তুলো দেয়ার মতো উপর্যুপরি গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যায়। সীমান্ত পেরিয়ে সেই গুলি প্রায় এক মিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে পড়ে। এরপরই আতঙ্কিত গ্রামবাসী পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নেয়। 


এদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সেনাবাহিনী ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সঙ্ঘাতের তৃতীয় দিনে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমার সরকার অন্তত চার হাজার অমুসলিম গ্রামবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছে।


গত শুক্রবার থেকে উখিয়ার বালুখালী ও রহমতের বিল সীমান্তে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু নাফ নদীর জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে চিংড়িঘেরের বেড়িবাঁধে তাদেরকে আটকে দিয়েছেন বিজিবি সদস্যরা। গত শনিবার রাতেও বিজিবি সদস্যরা রোহিঙ্গাদের ¯্রােত ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। পালিয়ে আসাদের মধ্যে ছিলেন বেশিরভাগ নারী-শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। এরই মাঝে আসছিল গুলিবিদ্ধরাও। গত শনিবার রাত পৌনে ৮টায় বালুখালী সীমান্ত দিয়ে জব্বার ওরফে জাবু নামে গুলিবিদ্ধ এক যুবককে বিজিবির প্রতিরোধের মুখে নাফ নদীর বেড়িবাঁধে কাতরাতে দেখা গেছে।

তার সাথে আসা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যরা শনিবার বিকেলে তাদের গ্রামে ঢুকে রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করছে। এতে মাত্র একটি গ্রামেই শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। ওই গ্রামের মৌলভী ফজল, নূর বশরসহ চার ভাইকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবারের সহিংস ঘটনার পর তারা বাংলাদেশে পালিয়ে না এসে ঘরেই অবস্থান করছিল। এর আগে রাতের আঁধারে পানি ভেঙে পালিয়ে আসা একই এলাকার সত্তরোর্ধ্ব সোলতান আহমদের সাথে দেখা হলে তিনি জানান, তার মেয়েকেও মিলিটারিরা নির্যাতন করে হত্যা করেছে।

মেয়েজামাতা নিখোঁজ রয়েছে। সেনাসদস্যরা অভিযানকালে তাকেও রাইফেলের বাঁট দিয়ে বেদম মারধর করে তাড়িয়ে দেয় বলে জানান তিনি। আসার পথে তিনি বিল ও জঙ্গলের পাশে অনেকের লাশ দেখেছেন বলে জানান।


ডান হাতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এমএসএফ-হল্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কামাল হোসেন নামে একজনকে। মংডুর ধুমবারিজা এলাকার আবু আহমদের ছেলে কামাল সেনাবাহিনীর গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর পালিয়ে এসেছেন।


সেনাবাহিনী মংডুর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলো ঘিরে রেখে সেখানে সামনে যাকে পাচ্ছে গুলি করছে বলে জানান তিনি। এ দিকে শনিবার বিকেল থেকেই নাইখ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে শত শত রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। 


রোববার সকাল পর্যন্ত টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও দমদমিয়া এবং উখিয়া পয়েন্ট দিয়ে বিজিবি ৮৬ জন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমকে ফেরত পাঠিয়েছে। সীমান্ত লাগোয়া গ্রামগুলোতে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলি শুরু করলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্টে এসে জড়ো হয়। অনেকেই নৌকা দিয়ে নাফ নদী পার হওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সর্তক অবস্থান নেয়। নাইখ্যংছড়ি তুমব্রু, ঘুমধুম, উখিয়ার বালুখালী, থাইংখালী, রহমতের বিল, পালংখালী সীমান্ত দিয়ে গভীর রাত অবদি শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ঠেকাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। 


জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযানের নামে নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে। এতে অনেকেই হতাহত হচ্ছেন। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বিজিবির প্রতিরোধর মুখে পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তারা নিতে পারছে না কোনো চিকিৎসা। 


বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল হাসান জানিয়েছেন, সীমান্তের শুন্য রেখা বরাবর অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালালেও তাদেরকে সীমান্ত অতিক্রম দেননি তারা। 


সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের মধ্যে বর্ডার গার্ড পুলিশের ১২৪টি সীমান্ত চৌকি রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে তিনটি সীমান্তচৌকিতে হামলার পর নতুন করে ৩০টি চৌকি বাড়ানো হয়েছে। এর আগে ৯৪টি চৌকি ছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি সীমান্ত চৌকি রয়েছে বাংলাদেশ সীমানার একেবারে কাছে জিরো পয়েন্টের মধ্যে। এ ছাড়া আরো রয়েছে ৩০-৪০ ফুট উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও। 


এ দিকে মিয়ানমারে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিপির চৌকি বাড়ানো ও সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও সেখানকার পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ওপারের গ্রামগুলো প্রায় মানুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এপারের বেড়িবাঁধের পাশাপাশি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার নারী-পুরুষ। সেনা অভিযান অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে রোহিঙ্গা ঢল আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। 
সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মাসে রাখাইন প্রদেশে সেনা মোতায়েন করার পর থেকেই ওই এলাকা থেকে পালাচ্ছেন রোহিঙ্গা মুসলিমরা। তবে বৃহস্পতিবার রাতের সহিংসতার পর শুক্রবার থেকে সীমান্তের গ্রামগুলোতে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। 


উখিয়া (কক্সবাজার) থেকে হুমায়ুন কবির জুশান জানান, আমরা বীরের জাতি, স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডে একটি গুলি পড়লে পাল্টা জবাব দেয়া হবে। আমরা পরিপূর্ণভাবে যেকোনো সমস্যা মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছি। অতিরিক্ত ১৫ হাজার বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল রোববার বিকেল ৪টায় সীমান্ত এলাকা ঘুমধুম বিজিবি ক্যাম্প পরিদর্শন করে বিজিবি সদস্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন প্রেস ব্রিফিংকালে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। 


সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯৬ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮২ জন সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম আর ১২ জন নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য।

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গা যোদ্ধারা পুলিশ পোস্টে হামলা ও একটি সেনাঘাঁটিতে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং তাদের নাগরিকত্ব প্রদানে জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন একটি প্যানেলের আহ্বানের কয়েক ঘণ্টা পরই এ হামলার ঘটনা ঘটে। আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি (এআরএসএ) এক টুইট বার্তায় হামলার দায় স্বীকার করেছে। মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ এনে এআরএসএ জানায়, তারা ২৫টির বেশি এলাকায় আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সংগঠনটির দাবি, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় রাথেতুয়াং শহর এলাকা দুই সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ। সেখানে রোহিঙ্গারা না খেয়ে মারা যাচ্ছে। মংডুতে তারা যখন একই কাজ করতে যাচ্ছিল, তখন বার্মিজ ঔপনিবেশিক বাহিনীকে হটাতে চূড়ান্তপর্যায়ে এই পদক্ষেপ নিয়েছি। এরপর শুক্রবার ও শনিবার রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত মাওন তাও, বুথিডাং ও রাথেডংসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অভিযান চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এ সময় তারা ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। অনেক এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে রোহিঙ্গা যোদ্ধারা। এখনো বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা আটক হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছে অন্তত ৫০ হাজার।

অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তের ঘুমধুম, তুমব্র“, রহমতের বিল, জলপাইতলী, ধামনখালী, কলাবাগান, তুমব্র“ উত্তর পাড়া, তুমব্র“ পশ্চিম পাড়ায় অবস্থান নিয়েছে। সেখানেও তাদের ওপর গুলি চালিয়েছে মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশ বিজিপি। 


বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, সীমান্তে হাজারো রোহিঙ্গা অবস্থান নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছে। তবে বিজিবি সতর্ক থাকায় তারা প্রবেশ করতে পারছে না। শনিবার দুপুরের পরে সীমান্তে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের ওপর মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশ বিজিপি গুলি চালালে এক ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাদের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। গতকাল বেলা দেড়টার সময় তুমব্র“ কোলাল পাড়া হয়ে ঢেঁকিবুনিয়া সীমান্তে মিয়ানমারের হেলিকেপ্টার চক্কর দেয়। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক মঞ্জুরুল হাসান খান জানিয়েছেন, তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নাফ নদীর ওপারে সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে। 


নতুন করে সংঘর্ষের পর কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাদের অনেকেই আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। গতকাল মিয়ানমার মংডুর কেফায়াত উল্লাহ জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনী গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। হুরটেইল কাইল্লা ভাঙ্গা গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। শত শত লোকজনকে ধরে নিয়ে গেছে। মেয়েদের নিয়ে গেছে নির্জন স্থানে। 


গতকাল রোববার মিয়ানমার ঢেঁকিবুনিয়া তুমব্র“ থেকে এসে এপারের ঘুমধুম এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে দুই হাজারের অধিক রোহিঙ্গা নর-নারী-শিশু। এর মধ্যে আবদুল্লাহ (১৮), জাহেদা বেগম (১৯), জয়নাল উদ্দিন (১২), আবুল কালাম (৬৭), তার স্ত্রী ওয়াজ খাতুন (৫০), রশিদ আহমদ (৬৫), জুহুরা বেগম (৪৫), রোকিয়া বেগম (২০), ছৈয়দা (১৭), মুজিবুর রহমান (৪৭), রশিদ (৩৫), আব্বাস (১২), ইউনুছ (৭), হাবিবা (৪), ওমাইর (৮ মাস), আছমা (১৯) রয়েছে। এরা জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনরা তাদের ঘর-বাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। সহায়সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে এবং মেয়েদের চরম নির্যাতন চালাচ্ছে। আর পুরুষদের ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। এ কারণে প্রাণ বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মরিয়ম বেগম (৫৫) জানান, তার স্বামী-ছেলেকে গুলি করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। তাই তিনি পালিয়ে এসেছেন। 
এ দিকে, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি মিয়ানমারের ঢেঁকিবুনিয়া ও তুমব্র“ গ্রামে রোববার সকাল থেকে প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ হয়েছে। গুলির শব্দে কেঁপে উঠেছে সীমান্ত এলাকা। ওই এলাকার মিয়ানমার সীমান্তে পাহাড়ে শত শত রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

মূলত মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি কৌশলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার কৌশল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ। এতে করে আতঙ্কে রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত জনপদের মানুষও। এর আগে শনিবার বেলা দেড়টায় ও বিকেল ৪টায় ঘুমধুম সীমান্তের কাছাকাছি মিয়ানমারের ভূখণ্ডে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।

শত শত রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ অবস্থান নেয়ায় মিয়ানমার পক্ষ আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলে সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। শনিবার বেলা ১১টার দিকে সীমান্তসংলগ্ন তুমব্র“ বাজারের কাছাকাছি এলাকায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী পুলিশ (বিজিপি) এক দফা গুলি ছুড়েছে। সীমান্ত পরিদর্শনে যাওয়া বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মফিদুল আলম এ কথা জানান।

বিজিবি কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনো মর্টার শেল পড়েছে কি না, খোঁজ নেয়া হচ্ছে। তবে সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেছে এবং ঘুমধুম সীমান্তে এখন দুই হাজারের অধিক নারী-শিশু জড়ো হয়েছে। 


বান্দরবান থেকে মিনারুল হক জানান, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম তুমব্রু সীমান্তের পাহাড়গুলোতে আরো কয়েক হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশের জন্য অবস্থান নিয়েছে। জিরো লাইনের সেখানে ছোট ছোট টিলার ওপর রোহিঙ্গারা পলিথিন দিয়ে ঝুপরি বানিয়ে থাকছে। অন্য দিকে ঘুমধুম সীমান্তের কলাবাগান এলাকায় শনিবার বিকেলে প্রবেশ করা সহ¯্রাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ এখনো অবস্থান করছে। তাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা খাবার ও পানি সহায়তা দিচ্ছেন। তবে কলাবাগান থেকে অনেক রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। 


এ দিকে গতকাল সকালেও মিয়ানমারের ঢেঁকিবুনিয়া এলাকায় রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়েছে। থেমে থেমে গোলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফলে আতঙ্কে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ও বিজিবির বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশের সীমান্তে ঢুকে পড়ছে। রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

গতকাল সকালে প্রাণভয়ে ঢেঁকিবুনিয়ার বাজার পাড়া থেকে ঘুমধুমে চলে আসেন ওই এলাকার মুদি দোকানি আবুল কাশেম। তিনি জানান, শনিবার হামলার পর থেকে সেখানকার গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। নির্বিচারে গুলি ও হেলিকপ্টার থেকে বোমা ফেলা হচ্ছে। কতজন যে ঢেঁকিবুনিয়া ও আশপাশের এলাকায় মারা গেছে তা আমরা জানতেই পারছি না।

কলাবাগান এলাকায় আশ্রয় নেয়া ছাবেকুন্নাহার জানান, দু’দিন বনেজঙ্গলে লুকিয়ে খেয়ে-না-খেয়ে জীবণ বাঁচিয়েছি। কিন্তু আমার বাবা-ভাই-বোন কে কোথায় কোনো খবর পাচ্ছি না। তারা বেঁচে আছে না মারা গেছে এই খবরটুকুও কেউ দিতে পারছে না। এদিকে সীমান্তের লোকজনদের অভয় দিতে ঘুমধুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে সভা করেছেন জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক। সভায় পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ছাড়াও জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। রোহিঙ্গারা যাতে সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকে পড়তে না পারে সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।

দেশীনিউজ/নাজিমুল গনি মামুন

অন্যান্য খবর