Floating Facebook Widget

মুক্তামনির অস্ত্রোপচার সম্পন্ন - Deshi News

১২ আগস্ট ২০১৭,শনিবার,দেশীনিউজ: প্রাথমিকভাবে মুক্তামণির অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। তার জ্ঞান ফিরে এসেছে। অস্ত্রোপচার শেষে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।

অস্ত্রোপচার শেষে দুপুর পৌনে ১২টায় ব্রিফিংয়ে চিকিৎসকরা জানান, অক্ষত রেখেই মুক্তামণির ডান হাত থেকে প্রায় তিন কেজি ওজনের টিউমার অপসারণ করা হয়েছে। 

ব্রিফিংয়ে মেডিকেল টিমের ২০ থেকে ২২ জন উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষ করে বার্ন ইউনিটের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবুল কালাম অস্ত্রোপচারের নেতৃত্বে ছিলেন।

তিনি বলেন, ডান হাত অক্ষত রাখা হয়েছে। অস্ত্রোপচার প্রাথমিকভাবে সফল। তবে তাঁকে ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না। কারণ, তার ফুসফুসের সমস্যাসহ অন্যান্য জটিলতা রয়েছে।

টিউমার শরীরের অনেক জায়গায় ছড়িয়েছিল। হাতের অংশটুকু বেশি খারাপ অবস্থায় ছিল। ওটা আজ অপসারণ করা হয়েছে। অপসারিত টিউমারটির ওজন প্রায় তিন কেজি।

মুক্তামণির শরীর থেকে সব টিউমার সরাতে আরও পাঁচ থেকে ছয়টি অস্ত্রোপচার লাগবে বলে জানান অধ্যাপক আবুল কালাম। ওর শারীরিক অবস্থা বুঝে পরবর্তী অস্ত্রোপচারের সময় ঠিক করা হবে। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে মুক্তামণিকে। যেদিন ও বাড়িতে ফিরতে পারবে, সেদিন আমরা বলতে পারব ও ঝুঁকিমুক্ত।’

ব্রিফিংয়ে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, এই সফলতা সম্মিলিত উদ্যোগ। সবার প্রচেষ্টার ফলে আজকে প্রাথমিকভাবে সফল হওয়া গেছে।

ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক চিকিৎসক জুলফিকার লেনিন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এখন পর্যন্ত যখন যা লেগেছে, সব করা হয়েছে। এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

এর আগে আজ শনিবার সকাল পৌনে নয়টা থেকে অস্ত্রোপচার শুরু হয়। 

গত ১১ জুলাই মুক্তামণিকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

বিরল রোগে আক্রান্ত শিশু মুক্তার রোগটি ‘হাইপারকেরাটসিস’ কিংবা ‘স্কিন ক্যান্সার’ হতে পারে বলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. নাসিরউদ্দিন জানিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, মুক্তামনির হাত বাঁচানো যাবে কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে, সেই সাথে কীভাবে এগোনো যায়, তা দেখা হবে।

বায়োপসি সম্পন্ন করার পর সোমবার চিকিৎসকরা জানান, মূলত রক্তনালীতে টিউমার হওয়ার কারণে হাত ফুলে যায় মুক্তামনির।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামারবায়সা গ্রামের মুদি দোকানি ইব্রাহীম হোসেনের ১২ বছরের মেয়ে মুক্তামনির ডান হাতে দেড় বছর বয়সে একটি ছোট গোটা দেখা দেয়। পরে তা বাড়তে থাকে।

বছর চারেক আগে এমন পর্যায় যায় যে তার স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হচ্ছে। আক্রান্ত হাতটি তার দেহের চেয়ে ভারি হয়ে উঠেছে, যন্ত্রণায় সব সময় অস্থির থাকে সে।

মুক্তামনির খবর গণমাধ্যমে আসার পর তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় সরকার, তাকে আনা হয় ঢাকায়।

এর আগে প্রথমে মুক্তামনির অবস্থা নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘‘মুক্তামনি বিরল ‘লিমফেটিক ম্যালফরমেশন’ রোগে আক্রান্ত বলেই আমরা ধারণা করছি।’’

ড. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকরা চারটি রোগের কথা ধারণা করলেও অনেকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে লিমফেটিক ম্যালফরমেশন রোগে আক্রান্ত মুক্তামনি। এটি একটি জন্মগত রোগ (কনজিনেটাল ডিজিস)।

এই রোগের বিশেষত্ব হচ্ছে জন্মের পরপরই কিছু ক্ষেত্রে এই এর প্রকাশ কারও ক্ষেত্রে পায়, কারও ক্ষেত্রে পায় না। মুক্তামনিরটা প্রকাশ পেয়েছে তার জন্মের দেড় বছর পর।’

মুক্তামনির চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তাকে ইতোমধ্যে দুই ব্যাগ রক্ত, ১ ব্যাগ প্লাজমা দেওয়া হয়েছে। তাকে হাসপাতাল থেকে ডাবল ডায়েট দেওয়া হচ্ছে। গত তিনদিনে মুক্তার রক্তের অনেকগুলো পরীক্ষা এবং ইউরিন টেস্ট করা হয়েছে। হয়েছে সিটিস্ক্যন, এমআরআই, ডুপ্লেক্স ও আলট্রাসোনোগ্রাফি। 

তিনি জানান, মুক্তামনির চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের আট সদস্য তাদের অভিমত দিয়েছেন। এর বাইরেও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ কবীর চৌধুরী এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জন সহযোগী অধ্যাপক জিএম মকবুল হোসেন তাকে দেখে গিয়েছেন।

প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব অভিমত দিয়েছেন। তবে টিস্যু পরীক্ষা ও বায়োপসি না করে কিছু কনফার্ম করে যাবে না। এখন এই মেডিক্যাল বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী তার চিকিৎসা পরিকল্পনা চলছে। সব রিপোর্ট হাতে পেলে আমরা সবাই মিলে বসে সিদ্ধান্ত নেব।

কতদিনে মুক্তামনি সুস্থ হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মুক্তার চিকিৎসা সহজ হবে না। এটি নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। এখানে মূল দায়িত্ব প্লাস্টিক সার্জারির। এর সঙ্গে অর্থোপেডিক, মেডিসিন, ভাসকুলার সার্জারি টিম এরা সবাই জড়িত থাকবে। তবে এটা বলতে চাই চিকিৎসা একধাপে চলবে না। ধাপে ধাপে সার্জারি করে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যাবে।’

চিকিৎসার শুরুতে মেয়ের এ কষ্টের জন্য চিকিৎসকদের অবহেলাকেই দায়ী করলেন তার বাবা ইব্রাহীম হোসেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) বার্ন ইউনিটে মেয়ের পাশে বসে ইব্রাহীম হোসেন সেদিন বলছিলেন, ‘আমার মেয়ে এতদিন চিকিৎসকদের অবহেলার শিকার হয়েছে।

গত কয়েক বছরে যত ডাক্তারের কাছে গিয়েছি, তাদের বেশিরভাগই মেয়েটাকে ঠিকমতো দেখতেও আগ্রহী হতেন না। মেয়েটা যদি সঠিক চিকিৎসা পেতো তাহলে রোগটা এত বেশি হতো না, মেয়েটা এত কষ্টও পেতো না। তিন বছর আগে খুলনার এক ডাক্তার বলেছেন, ‘আপনার বাচ্চার ক্যান্সার, বেশিদিন আয়ু নাই, ফাও ট্রিটমেন্ট করাইয়েন না।’

সাতক্ষীরার কামারপাশা গ্রামের মুদি দোকানি ইব্রাহীম হোসেন বলেন, ‘ডাক্তারের এই কথা শুনে মেয়ের চিকিৎসাটা বন্ধ রাখছিলাম। কিন্তু সেই ডাক্তারের বলা ১৫ দিন যেতে যেতে যখন আজ  তিন বছর পার হলো, তখন আবার মেয়েটাকে নিয়ে আশার আলো দেখছি; আমার আর কিছু চাওয়ার নেই, আল্লাহ যেন আমার মেয়েটাকে সুস্থ করে তোলেন।’ 

মুক্তামনিকে ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালসহ সাতক্ষীরা ও খুলনার নানা হাসপাতালের চিকিৎসকদের দেখিয়েছিলেন ইব্রাহীম হোসেন। কিন্তু চিকিৎসার পরিবর্তে হতাশ হতে হয়েছে। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি বলেন, ‘এখন আর আমি হতাশ নই, দেরিতে হলেও ঠিক জায়গায় আমি আসতে পেরেছি, এটাই এখন সান্ত্বনা।’

সাতক্ষীরা থেকে ১০ জুলাই রাতে মুক্তামনির পরিবার ঢাকায় এলে মঙ্গলবার সকালেই তাকে ভর্তি করা হয়। তার চিকিৎসায় ইতোমধ্যেই ৮ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। 

বিরল এক রোগে আক্রান্ত হয়ে ১১ বছরের মুক্তামনি এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি আছে। তার এক হাত ফুলে গিয়ে দেহের চেয়েও ভারী হয়ে গেছে। সাদা রঙের শত শত পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই ফুলে যাওয়া অংশে।

চার বছর ধরে এই ‘বোঝা’ বয়ে বেড়াচ্ছে ছোট্ট শিশুটি। শরীরের অসহ্য ব্যথা ও যন্ত্রণায় খেলাধুলা তো দূরের কথা, ঠিকমতো বসতেও পারে না মুক্তামনি। স্কুলেও যাওয়া হয় না তার।

মুক্তামনি কবে থেকে এই রোগে আক্রান্ত জানতে চাইলে তার বাবা ইব্রাহীম হোসেন বলেন, ‘জন্মের দেড় বছর পরপরই তার ডান হাতের কুনইয়ের উপরের অংশে চামড়ার নিচে এক ধরনের গোটা হয়।তখন থেকেই ডাক্তারদের কাছে ঘুরছি। প্রথমে সাতক্ষীরার এক চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি হাড়ে টিউমার হয়েছে বলে জানান।

তার ওষুধ খাওয়ালে গোটা কমে যায়, আবার হয়। এরপর গেলাম সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে। সেখান থেকে খুলনা হাসপাতাল। খুলনায় এক্সরে করার পর তারা বলে হাড়ে ইনফেকশন।

ওষুধ খাওয়ার পরও কোনও উন্নতি না হওয়াতে যশোর যাই। সেখানে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ খাওয়ানোর পর চামড়ার নিচের গোটা আর দেখা যায় না।

কিন্তু একমাস পর আবার গোটা দেখা গেলে ফের হাসপাতালে যাই। ঢাকা থেকে তখন একজন অর্থোপেডিকসের চিকিৎসক যান যশোরের মা ও শিশু হাসপাতালে। তিনি বলেন, ‘এই বাচ্চার বুকের নিচের হাড়ে গোটা, পিঠে গোটা, হাতে গোটা-অপারেশন কয় জায়গায় করব।’

ইব্রাহীম হোসেন বলেন, এই কয়েক বছরে ডাক্তারদের কী পরিমাণ অবহেলা যে আমদের দেখতে হয়েছে। যেখানে গেছি সেখানেই আমরা অবহেলিত হয়েছি।’ ইব্রাহীম হোসেন বলেন, ‘আমার নিজের স্পাইনাল কর্ডের সমস্যা ছিল, কিন্তু মেয়েটার জন্যই হয়তো আল্লাহ আমাকে সুস্থ করেছেন।’ এসময় পাশ থেকে মুক্তামনি বলে ওঠে, ‘আব্বু যদি সুস্থ না হতো, তাহলে আমারে দেখতো কে?’

মুক্তামনিকে সাভারের সিআরপি, ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েও নিয়ে গেছেন ইব্রাহীম হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা ঘুরে খুলনার আদদ্বীন হাসপাতালে গেলে সেখানকার একজন ডাক্তার বলেন, “বাচ্চার ক্যান্সার, বেশিদিন আয়ু নাই, ফাও ট্রিটমেন্ট করাইয়েন না।”

তারপর থেকেই ডাক্তারদের কাছে যাওয়া বন্ধ করে দেই। কারণ, মেয়েটাকে নিয়ে ঘুরলে তারও খুব কষ্ট হতো। ভেবেছি, যে কটা দিন  বাঁচে, মেয়েটা যেন কষ্ট না পায়। তারপর কতশত হোমিওপ্যাথি আর কবিরাজের ওষুধ খাইয়েছি, তার ঠিক নেই। কিন্তু এরই মধ্যে মেয়েটার হাতের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। বাসা বেঁধেছে পোকা। হাত শরীরের চেয়েও ভারী হয়ে উঠেছে।’

মু্ক্তামনির মা আছমা খাতুন বলেন, ‘এত বছর ধরে দেখতে দেখতে এখন আর কিছু মনে হয় না, এটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে।’ পাশে থাকা মুক্তামনির জমজ বোন হীরামনি বলে, ‘আমাদের টিভি ছিল না। কিন্তু বোনের সময় কাটে না, খালি কান্না করে- এজন্য আব্বু টিভি কিনে দিছে। ওর জন্য আমার খুব কষ্ট হয়, আপনারা আমার বোনটারে ভালো কইরা দেন।’

এদিকে, এতোগুলো বছর ধরে মুক্তামনি সঠিক চিকিৎসা পায়নি বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন ঢামেক বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে এসেও একটি মেয়ে এভাবে চিকিৎসার অভাবে পড়ে আছে, এটা ভেবে আমি যারপরনাই বিস্মিত, এটা কী করে হতে পারে।’

মেয়েটির সুস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘মুক্তামনি রক্তশূন্যতা ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। তাকে রক্ত ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। তাকে অপারেশনের জন্যে উপযুক্ত করতে দুই-তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। তবে আমরা হতাশ নই, দেখা যাক কী হয়।’

দেশীনিউজ/দুলাল হোসেন/ ইস্টাফ রিপোর্টার

স্বাস্থ্য ও রূপচর্চা