Floating Facebook Widget

রাতের আঁধারে ঢুকছে রোহিঙ্গারা - Deshi News

২২ নভেম্বর ২০১৬,মঙ্গলবার,দেশীনিউজবিডিঃ বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের কঠোর অবস্থানের পরও রাতের আঁধারে ঢুকে পড়ছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। 

রাতের টেকনাফ। সড়কে তখন যানবাহন চলাচল কম। ঠিক তখনি নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে কিছু নারী, পুরুষ ও শিশু। ভেজা শরীর, এক হাতে ঝুঁড়ি আরেক হাতে শিশু। ক্যামেরায় ছবি তুলতে দেখে ভয়ে দ্রুত সড়ক পার হয়ে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গা।

পরে ভয় কাটিয়ে জীবন বাঁচাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কেয়ারিফারাং গ্রাম থেকে পালিয়ে শিশুসন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়া মোহাম্মদ আয়াছ জানান, মিয়ানমারে পুলিশের নির্যাতনের শেষ নেই। কি নারী, কি বৃদ্ধা, কি শিশু কাউকে ছাড়ছে না তারা। সবাইকে নির্যাতন করে ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। 

তিনি আরো জানান, গত ১৩ অক্টোবর তার পরিবারের ৫ জন হত্যা করেছে আর ৫ জনের কপালে কী ঘটেছে তা তার জানা নেই। গত শুক্রবার আবারও হামলা চালায় পুলিশ। অনেককে গুলি করে হত্যাও করছে। যার কারণে বেঁচে থাকা শিশুসন্তানকে নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে নাফ নদী হয়ে বাংলাদেশ আশ্রয়ের জন্য চলে আসেন তিনি।

শুধু মোহাম্মদ আয়াছ নন, তার সঙ্গে নৌকা নিয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে আরো ২০ জন। এভাবে বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রাতের আঁধারে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারিকে ফাঁকি দিয়ে অনুপ্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা। তারপর বাংলাদেশে ঢুকে কেউ কেউ পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে পাহাড়ে, কেউ সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের কাছে, আবার কেউ কেউ গাড়িযোগে চলে যাচ্ছে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে।

কথা হয় অনুপ্রবেশকারী সাবেকুন্নাহারের সঙ্গে। কান্নারত সাবেকুন্নাহার জানান, পরিবারের ১২ সদস্যের মধ্যে কে কোথায় আছে তার কিছুই জানেন না তিনি। শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য দুই কন্যাশিশুকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। 

তৈয়বা বেগম নামে আরেকজন জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুব বেশি নির্যাতন করছে। তারা ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে লুটপাট করছে। এ ছাড়া মেয়েদের ধরে নিয়ে অস্ত্রের মুখে নির্যাতন করছে।

পালিয়ে আসা মিয়ানমারের মংডুর চিংদিপাড়ার জাফর মিয়া জানালেন, মিয়ানমারে নির্যাতনের কারণে ৫ পরিবারের ২০ সদস্য বাংলাদেশে চলে এসেছেন। আরো শতাধিক মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য নাফ নদীতে অবস্থান করছে।  

সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়া একটি রোহিঙ্গা পরিবার 
 
গত ৯ অক্টোবর তিন সীমান্তচৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার পর, রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যে অভিযান শুরু করেছে, তাতে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা ভিটেছাড়া হয়েছেন বলে জানিয়েছে কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্স (ওসিএইচএ)।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর মনে করে, অভিযানের মুখে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে, ভিটেছাড়া মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা দরকার। না হলে বহু মানুষ অনাহারে রোগেশোকে মারা যাবে। কারণ, হতভাগ্য মানুষগুলোর আশ্রয় নেওয়ার সব পথ বন্ধ।

এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমর ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার সৈকত বিশ্বাস বলেন, ‘মিয়ানমারে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কিছু কিছু মানুষ নির্যাতিত হয়েছে এবং অনেক নারী ও শিশু অনাহারে আছে। তারা আর ঘরবাড়িতে ফিরতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে প্রথম যেটি প্রয়োজন সেটি হলো তাদের মানবিক সেবাটি নিশ্চিত করা। সে ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে এসব মানুষের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে মানবিক সেবা প্রদান করাটাই হবে প্রধান কাজ।’ 

এ কর্মকর্তা আরো বলেন, এ বিষয়টি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তাই সমাধান তাদের ভেতর থেকে এলে ভালো হয়। তারা যদি তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তাহলে এ সমস্যাটা আর থাকে না। এটি ধীরে ধীরে কমে যাবে। যে জন্য সবারই উচিত সমস্যাটি সমাধানে মিয়ানমারকে অনুরোধ করা।’

এদিকে মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সীমান্তে সার্বক্ষণিক টহল ও অতিরিক্ত জওয়ান মোতায়েন করেছে। তারই ফলে গত কয়েক দিনে নাফ নদী থেকে মিয়ানমারের ১০৭ জন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে দেয়। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে আরো ১২৫ জন রোহিঙ্গাকে নাফ নদীর নয়াপাড়া পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে বাধা দেয় এবং তাদের ফিরিয়ে দেয় কোস্টগার্ড। 

সেনা অভিযানে এখন পর্যন্ত ৬৯ জন রোহিঙ্গার মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে মিয়ানমার। তবে এদের সবাইকে সন্ত্রাসী দাবি করেছে দেশটি। যদিও এই তথ্যের সঙ্গে একমত নয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
 

এক্সক্লুসিভ