Floating Facebook Widget

নিসর্গ চিন্তায় কিছু কবি ও তাদের কবিতা - Deshi News

সাহিত্যের সকল শাখার মধ্যে কবিতাকে সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করেছেন সাহিত্যবোদ্ধা ও সমালোচকগন। কেবল কবিতার মাধ্যমেই বোধের গভীরতম তল স্পর্শ করা যায়। কবিতার মাধ্যমেই চিত্রকল্পে আঁকা হয়ে যায় অদৃশ্য বাস্তবতা। নৈরাশ্য, বঞ্চনা আর না পাওয়ার শূণ্যতা কবিকে ভীষণভাবে ব্যথিত করে তোলে। এই কবিই আবার প্রকৃতির রূপ, রস ও সৌন্দর্যে হয়ে ওঠেন অত্যন্ত আবেগ বিহ্বল। সৃষ্টি হয় অমর বাণী, কবিতা। কবিতায় ফুটে ওঠে প্রেম, প্রকৃতি ও সুন্দর। কবিতায় ফুটে ওঠে বিরহের যত কথা আর বিপ্লবী চেতনা। অসুরের বিরুদ্ধে কবির কলম হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার আর সুরের মূর্ছণা।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যবোধ, নিসর্গলালন আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়-এসবই আজকের পৃথিবীতে প্রধান আলোচ্য বিষয়। পৃথিবীর সব অঞ্চলে, সব দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ভাবিয়ে তুলেছে প্রকৃতি সচেতন মানবকূলকে। সমকালীন কবিতায় যেমন ধনতন্ত্রবাদ, অর্থনৈতিক অরিয়েন্টালিজম, বিমাতাসূলভ আচরণকারী বিশ্বায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন অথবা মানবিক অবক্ষয় সর্বাগ্রেই ধরা পড়ে কবির চেতনায়। কবির উর্বর মস্তিস্ক এসব অসঙ্গতিকে তুলে ধরে কবিতায়।

প্রযুক্তির যুগে বসে নিসর্গ সৌন্দর্যমুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির গুনগান বড্ড বেসুরো লাগে। এ ধরনের গুনগান বেশ হয়েছে বিভিন্ন দশকের কবিদের কবিতায়। কবি জসীমউদ্দীন এই শ্যামলী বাংলাদেশের প্রকৃতি তুলে এনেছেন তার কবিতায় সুনিপুণভাবে। নদীঘাট, পল্লীবধু, বাঁশির সুর কবিকে মুগ্ধ করেছে নিরন্তর। জীবনানন্দ দাশেরর ধ্যান, জ্ঞান, সাধনাই ছিল প্রকৃতি। জীবনানন্দর কথায় ‘ইঁট বাড়ি সাইনবোর্ড জানালা কপাট ছাদ সব চুপ হয়ে ঘুমাবার প্রযোজন বোধ করে আকাশের তলে’। তার কথায় কংক্রিটাইজেশন কখনোই প্রশান্তির যোগান দিতে পারেনা, দিতে অক্ষম, যা দিতে পারে একমাত্র প্রকৃতি।

জনসংখ্যা বিস্ফোরণের একবিংশ শতাব্দিতে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। বাংলা ভাষাভাষির এই বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে নদীগুলে শীর্ণ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ, নিধন হয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চল, হারিয়ে যাচ্ছে পাখিসুর, বিপন্ন হচ্ছে প্রকৃতি আর ধূসর চাঁদরে ঢেকে যাচ্ছে নৈসর্গিক সৌন্দর্য। এমতাবস্থায় শুধু নিসর্গ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে কবিতা লিখলে তা কবিতার ইতিহাসে সেটা বড় একপেশে মনে হবে। তাই সময়ের প্রয়োজনেই কবিকে সমকালীন হতে হবে। কবিকে তার কবিতায় তুলে ধরতে হবে সব সমস্যা, আবার কবিকেই দেখাতে হবে সমস্যা নিরসনের ইতিবাচক পথ। নৈরাশ্যের পথে কবি হাঁটলে জাতি হতাশ হয়ে পড়বে। তাই কবিকে হতে হবে আশাবাদের মূর্ত প্রতীক, কবিতা হতে হবে বাস্তবতার স্বাক্ষর।

সমকালীন কবিরা বিশ্বায়ন, পুঁজিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, নৈরাশ্যবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয় তুলে আনছেন তাদের কবিতায়। সমস্যার ফল নিয়ে ভাবছেন কিন্তু কারণ থেকে যাচ্ছে অদৃশ্য। শূণ্য দশকের কিছু কবি প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য রক্ষার্থে পাঠকবোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। পাঠক আর সমালোচক দৃষ্টিতে কবিতাগুলো অবোধগম্য শব্দে ঠাসা হতে পারে, জটিল চিত্রকল্পে ঢাকতে পারে কবিতার শরীর, উপমা আর অলংকারে ভেসে যেতে পারে কবিতার অবয়ব, আবার কোন কোন কবিতায় থাকতে পারে শব্দ অলংকরণের অসমন্বয়। কিন্তু কবিতার গুনবিচারে সেগুলো কতটা কবিতা হয়ে উঠল তা কবিতা সমালোচকরাই বিচার করবেন কবিতার মানদন্ডে। তবে কবিতাগুলো যদি নিসর্গ রক্ষার্থে মানবিক বোধ জাগিয়ে তুলতে বিন্দুমাত্র ভুমিকা পালন করতে পারে, তাহলে কবিতাগুলো কিছুটা স্বার্থক কবিতা হয়ে উঠবে বলে আমি মনে করি।

নিসর্গবাদী কবিদের কবিতায় নদীকে তুলনা হয় কখনো পল্লীবধু, কখনো কুমারী ষোড়শী আবার কখনোবা পূর্ণযৌবনা নারীর সাথে। নারী শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যে সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে সেই একই সৌন্দর্য খুঁজে পান নিসর্গবাদী কবি নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে—

‘সারেং জল কাটেন—জল কাটেন চতুর হাতে
কাকুলির তিন নম্বর ঘাটে
তারপর এ ঘাটে ওঘাটে জল কেটে কেটে
আমিও কাটি জল— গ্রাম থেকে গ্রামে
তাতে, আমার সব হয়েছে
তার হয়নি, যিনি সারেং
খামোখাই জল কাটাকাটি জল ভাগাভাগি
যুবতী ফেরির বুকে ছেঁড়া পাল আর মাস্তুলে...’
—মুজাহিদ আহমেদ/সারেং

মায়ের কোলে বেড়ে ওঠে শিশু স্নেহের বন্ধনে। গ্রামের পাশ দিয়ে যে নদী বয়ে যায় সে নদীর মাতৃস্নেহে লালিত শিুশু কখোনই ভুলতে পারে না নদীযৌবন। যে একচরণ কবিতা লেখেনি কখনো সে পাষাণ হৃদয়ও এই নদীর মায়ায় মোহিত থাকে আজীবন। কিন্তু গ্রীষ্মের দাবদাহে এই নদী যৌবনহীনা হয়ে গেলে কেঁদে ওঠে প্রেমিক মন। নদী মরে গেলে তার স্নেহাশিষ পরশও মরে যায়। মরে যায় হলি খেলা কিশোর-কিশোরীর। আর সেই বুকে লাঙলের ফলা চালিত হলে মাছেদের নির্বাসনে যেতে হয়। কংক্রিটবন্দী হয়ে যায় নদী যৌবন। ক্ষয়িষ্ণু যৌবনা নদী প্রভাবিত করছে শূণ্য দশকীয় কবিদের—

‘নিজেকে নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকি আরো কতটা দিন এভাবে।
কেই এসে উৎসাহ দেয়নি সরে দাঁড়াবার।
যাইন কারো কাছে এক মুঠো বৃষ্টির তাগিদে। দাঁড়িয়ে থেকে থেকে
একদিন বরফ হয়ে গেলাম।
রোদের উষ্ণতা আমাকে জল বানিয়ে ছেড়ে দিল নদে
এখন নদী আর আমি খুব কাছাকাছি।’
—মুজাহিদ আহমেদ/নদী আর আমি খুব কাছাকাছি


‘নদীর জল কতোটা বুড়ো হলে সাগরে গড়ায়
জানা হয়নি প্রায় পয়ত্রিশ বছরে।
কতোটা দেরী করে এলে ঘুমোতে হয় বাসি
বিছানায়— অথবা কতোটা দিন পার করে দিলে
এক মন থেকে আরেকটি মন এমনিতেই মুছে যায়
বুঝিনা—
জেনেছি, মন থেকে মন বড়ো বেশী আড়াই দিন
দূরে গেলে সাগরে হারায়।’
—মুজাহিদ আহমেদ/মন থেকে মন

ব্রম্মপুত্র দহনে জ্বলে যাই,
হা নদী বিদীর্ণ-শুষ্ক ক্ষীণবক্ষা
তপ্ত পারদ ঢেলে দিয়েছে কে
গৌরিশোকে,
মুহ্যমান ক্ষণিক নিরবতায়
—রিসি দলাই/নদীকথা অথবা নিজের মখোমুখি

আমার মৃত্যুর দিন বৃষ্টি হবে দিনভর, আমার সান্ধ্য পথ
হারাবে আন্ধারে—কামুকসূর্যাস্তে। সূর্যের আন্ধারে স্থির বরফ
আর প্রাণের মিলিত উচ্ছ্বাস থেমে থেমে আসবে ব্যাকুল
বিষণ্নঈশ্বরী—
... ... ... ... ... ... ... ... ...
আমার কন্যার চোখে জল টলমল, আর পুত্রের চোখে দারুণ
হতাশার জলছবি; অক্ষম-আক্রোশ-শুর হলে আলোড়ন রজনী
গন্ধায়— জলে বল্কলে শুয়ে, প্রান্তরের গলে যাওয়া রোদ এসে
নদী নদী ঢেউ ভুলে চুমু খাবে বয়স্কসন্ধ্যায়।
—মোহাম্মদ নূরুল হক/আমার মৃত্যুর দিন—১


জাদুঘরে আরো মৃত মাছ আনা হবে

মাথা ও কাঁটা দেখে শরীর চিনেছি
একটু ছায়া দেখিনি আলোর বিপরীতে

সহসায় অনেক অনেক প্রত্ন-ইতিহাস
লেখা হবে মাছেদের নিয়ে

পোনা ছাড়ছে না মা-মাছেরা
আর কতবার ধর্ষিত হবে মা?
—মনিরুল মনির/হালদা নদীর অসম্পূর্ণ সেমিনার

ভোরের রাগে পাখিদের গান কে না শুনতে ভালবাসে? কোকিলের কুহুতান নিয়ে রচিত হয়েছে কত গান আর কবিতা তার ইয়ত্তা নেই। ফুলে ফুলে ভ্রমর আর প্রজাপতির খেলা, নবযৌবনা সবুজ মাঠ, ফলবতী ফসলী মাঠ আর বৃক্ষ, রং বেরঙের ফুল, পাখি মুগ্ধ করে কবিমন। এই মুগ্ধতা থেকে যুগে যুগে রচিত হয় অগনিত কবিতা চরণ, কেউ কেউ হয়ে ওঠেন প্রকৃতির কবি। সূর্যের প্রথম পরশ যে কচি পাতায় খেলে যায় সেকি ভুলতে পারে রোদমাখা প্রেম? সেকি চায় কোন অন্ধকার মুছে দিয়ে যাক ভোরের আলো? কিন্তু কালের পরিক্রমায় প্রকৃতির রূপ, রস সৌন্দর্য আজ বিপন্ন প্রায়। যান্ত্রিকতার যাতাকলে অতিষ্ট হয়ে উঠছে আমাদের জীবন। ফসলী মাঠে গড়ে উঠছে অট্রালিকা আর বিশাল প্রাসাদ। গড়ে উঠছে বসতী বাড়ী, অফিস। শহুরে কাকের কা কা সুরে হারিয়ে যাচ্ছে কোকিলের কুহু সুর। ডাস্টবিনের পাশে খাবারের সন্ধানে থাকে বস্তির শিশু এবং শহুরে কাক আর কুকুর। কোথায় প্রকৃতি সৌন্দর্য আমাদের আঙিনায়? এই বিয়োগ, এই হারানো সুর মুখ্য হয়ে উঠেছে উত্তরাধুনিক কবিতায়—

সাদা ও কালোর মধ্যে
ব্যবধান ঘুচাতে রঙভর্তি আকাশ মেঘের সাথে মিতালী করে।
আমূল মেঘের চাপে এ এক রঙের রেণু ছড়ায় মৃদু মন্থর
বাতাসে, খর-জমিন জলের অতীত খুঁজে সাতরঙ;

মেঘের কাছে রঙের নিযতি, বিস্ময়ের রেখা
কপালের দাগ বিগগ্ধজনের তুলির আঁচড়, লতা-পাতা-

সবুজের মৃত মাঠ মলিন হয়ে গেছে, রাখেনি কথা।
—মনিরুল মনির/সবুজের মৃত মাঠ মলিন হয়ে গেছে


শালিক, পায়ে পায়ে আমাদের মৃত্যুর বাড়ি
ও পাখি, পায়ে পায়ে তোমাদের মৃত্যুর বাড়ি
চারপাশে আমরা-তো সবাই শববাহক
চারপাশে তোমরা-তো সবাই শববাহক
কাজের শেষে গাছ গাছে সনধ্যা নামুক
আর ভোরের আলোরা পাখি হোক পাখি হোক।
—প্রেমালাপ ০১/সরসিজ আলমি


চিত্রকল্পের ব্যবহার বুঝিয়ে দেয় কবির কবিতা কতটা স্বার্থক হয়ে পাঠকের কাছে ধরা দেয়। নৈসর্গিক চিত্রকল্প পাঠক অনুভুতিকে দোলা দিয়ে যায়। খরস্রোতা নদী, নদীর পাড় ঘেসে একপেয়ে পথ আর সে পথে হেঁটে যাওয়া গাঁয়ের বধু, বৃক্ষ শাখায় বসে ভোরের রাগে পাখি গান, কখনো সবুজ আবার কখনো হলুদ পেড়ে শাড়ি পরা ফসলী মাঠ, পাতার ফাঁকে ফাঁকে লুকোচুরিসমৃদ্ধ কবিতাকে অলংকার শোভিত নারীর মতোই মনে হয়। শূণ্যের কবি তার কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন সুনিপুনভাবে—

এই রাত নদী হবে খরস্রোতা... তুমুল শব্দের
কবিতার সরোবরে রাজহাঁস কাটুক সাঁতার
তুমি আমি ভেসে যাব লখিন্দর বেহুলার গ্রামে
তুমি আমি রাধা-কৃষ্ণ...শিরি-ফরহাদ;
না কি আমি দেবদাস; তুমি সেই বিখ্যাত পার্বতী?
—তুমি আমি এবং কবিতার সংসার/ মোহাম্মদ নূরুল হক


সোনালি আন্ধার নামে আমাদের হৃদয়নগরে
আমাদের স্নানঘাটে ঘুমভাঙা মাছের মিছিল
জলের গভীরে কেঁপে ওঠে—
আমাদের বোনদের কামরাঙা দেহের বন্দর!
বৃক্ষদের পাতাশূণ্য শাখায় এখন
বসে আছে একজোড়া কামান্ধ শকুন
দেখো ক্লান্তি জমে আছে রঙহীন ধুলোর বিকেলে
একমুঠো সন্ধ্যা আজ সেরে ওঠে জোনাকির ভুলে।
—দেখো আজও লালন সভ্যতার সতর্ক প্রহরী/ মোহাম্মদ নূরুল হক

শূণ্যের কবিদের কবিতায় পুঁজিবাদী আগ্রাসন, বিশ্ব অথনীতি বাজার, বিশ্বায়নের হিংস্র থাবায় উন্নয়নশীল জাতিসমূহের বেহালদশা, কংক্রিটাইজেশন, শহরায়নই মুখ্য বিষয় হিসেবে দেখা যায়। চিত্রকল্পের ব্যবহার খুব বেশী না থাকলেও তাদের চিত্রকল্পের পাঠকমনে দাগ কাটতে সক্ষম—

ক্যানভাস ছেড়ে উঠে আসে সোনালী কবুতর— উড়ে যায়, খেলা করে।
বিমুগ্ধ তুলি উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিম।
একজন কামার ষোড়শি বধুর নরম উষ্ণতায় তাবৎ পৃথিবী কোলে তুলে নেয়।

শিল্পিত ধূসর চোখ অবাক বিস্ময়ে দেখে যায় তুলির সেই অপূর্ব রক্তপাত...
—রঙ ও তুলি /রিসি দলাই

গ্রীণ হাউজ ইফেক্ট এর কবলে পড়ে পৃথিবীর জলবায়ু ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। যার ফলে প্রখর রোদে পুড়ছে ফসলী মাঠ, উজাড় হয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চল। বিপন্ন হচ্ছে প্রকৃতি। হারিয়ে যাচ্ছে নিসর্গ আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য। নিসর্গ হারানো করুণ রোদন ফুটে উঠছে সমকালীন কবিতায়। আবার প্রকৃতি বিপর্যয়ে নিরাশ হয়ে অনেক কবি উপমাকে আশ্রয় করে দাড়িয়েছেন বক্রাঘাত বা শ্লেষউক্তির (Irony) কাতারে—

রোদে পাতারা পুড়ে ছাই হয়না সর্বস্ব হারায়, জল
হারিয়ে গাছ হয়ে গেছে কাঠ, কয়লার উপকরণ

অথচ বহু অমলিন পথ মাড়িয়েছি, বাতাসে
মর্মর পাতা উড়ে এসছে পদচাপে গুঁড়ো
হতে হতে— এটাই অনন্তকালের পথ
রোদে পাতারা প–ড়ে/মনিরুল মনির

সন্ধ্যার হাটে মাছেরা প্রতিদিন যেতে থাকে

প্রক্ষালনের দায়ে মুছে যায় জলাশয়,
শাবানের প্রস্তুতকারক মৎস্যগন্ধ নিবারণের
বিজ্ঞাপন ছাড়ে দোকানে দোকানে;
আর শাবানমুখি রমণীমোড়ক জল কিনে
শাধনে যাবেন বিশুদ্ধজল প্রস্তুতকারী

সকল ভৌত কারখানা

জলের বোতলে আমরা বিশুদ্ধ হতে চাই!
—জলের অ্যানাটমি/মনিরুল মনির

নিসর্গ হারানো বেদনায় অনেকে বাস্তবতার কষাঘাত থেকে থেকে পালিয়ে থাকার মনোবৃত্তি পোষণ করেছেন—

এ পোড়ামুখ আবারও পুড়ে যাক; হয়ে যাক খাক্
সুস্থ কোন শ্যামল শস্যের আবাস হোক কেউই
চায় না
কাম্য নয় একান্ত নিজেরও
... ... ... ... ... ... ... ... ...
রাতের ব্যাপক যাত্রা শুরু হলে
কত মুখ পোড়ে। কত সুখ উড়ে
ছাঁই হয়ে ভেসে যায় প্রতিবেশী থামেশ্বর নদে
—হাসামপুর নিয়ে আরেকটি লেখা/ মুজাহিদ আহমেদ


মাছিরাজ্যে বসবাস আমাদের— হাসছি খেলছি নাচছি ভাসছি
নিমগ্ন কোলাহল চারদিকে; স্তিব্ধ প্রাচির গড়ছি হৃদয়ে, অন্ধ অপরূপ
প্রাচ্য-প্রতিচ্যের ঢেউ খলোনো শূণ্যতা নামছে উঠোনে
—তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক ইঁদুর/রিসি দলাই


মুঠোভর্তি সন্ধ্যা নিয়ে দঁড়িয়েছি জলের উপর
একমুঠো সন্ধ্যা আজ ঘুমন্ত আকাশে—উড়ালাম
অনর্থক কবিতার রতিপাতে ঘেন্না জম্মে গেলে—
সিলিঙ ফ্যানের পাখা—ঘরের সিলিঙ ভেঙ্গে ভেঙ্গে
পুকুরের সাবালক জলে শরীরের ঘুর্ণি তোলে
—আটপঙ্ক্তির বাসর শয্যায় নবম পঙ্ক্তি হাসে/মোহাম্মদ নূরুল হক


একচল্লিশ বছরের পরমায়ুর নিচে চাপা পড়া ঘাস, একটি শালিক চাপা উল্টিয়ে দ্যাখে ঘাসের গা থেকে সবুজেরা নিখোঁজ, কিন্তু শালিক পাখি নির্বিকার।

—এই সবজি/সরসিজ আলীম

যাইহোক, কবিকে কবি হিসাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই নিসর্গকে আপন ভাবতে হবে, আপন করে নিতে হবে, আপন করা শিখতে হবে। কবিকেই দেখাতে হবে প্রকৃতিকে সকল প্রকার বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার উপায়। কিন্তু শূণ্য দশকের কবিতা বিশ্লেষণ করে যা দেখা যায় তা হলো, অধিকাংশ কবিতাকেই শূণ্যতা ঘিরে রেখেছে। কবি হাঁটছেন অলৌকিক স্বপ্ন আর পরাবাস্তবতায়। দূর্বোধ্য কবিতাকেই কালিক কবিতা হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কবিতায় গতিময়তা, সহজবোধ্যতা আর সাবলীলতা না থাকলে হাজার কবিতা লিখলেও সেগুলো বস্তবন্দী অকবিতার স্বীকৃতিই পেতে পারে। পাঠকই যদি তৈরী না করা যায়, অথবা পাঠক কবিতার স্বাদ গ্রহণ না করতে কবিতা পড়বে কেন? পলায়নপর মনোভাবই যদি কবিকে ঘিরে ধরে তবে নৈরাশ্যবাদ ঘুচাবে কে? তাই নতুন প্রজন্মের কবিকে এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে কবিতার ভ্রান্ত পথ থেকে সরে আসতে হবে। তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে সেই পথে, যে পথ দেখাবে মুক্তির সকল পথ সময়ের প্রয়োজনে।

ইতিহাস ঐতিহ্য