Floating Facebook Widget

ঈদ বাজারে ভারতীয় আগ্রাসন - Deshi News

দেশিনিউজবিডি.কম,

৮ জুলাই ২০১৫, বুধবার, ঢাকাঃ

 পোশাকশিল্পে বাংলাদেশের সুনাম বিশ্ব জুড়ে। অথচ ঈদ এলেই বিষয়টি বেমালুম ভুলে যান দেশের সব স্তরের ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। সবাই মেতে উঠেন আমদানি করা বিদেশি পোশাক নিয়ে।

 

ঈদ মুসলমানদের ঘরে ঘরে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। ঈদে আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় নতুন পোশাক। নতুন পোশাক ছাড়া ঈদ যেন অকল্পনীয়। এর সুযোগ নেন ব্যবসায়ীরা। তারা বাহারি নামের বিদেশি পোশাক আমদানি ও বিক্রি করেন। বিশেষ করে ভারতীয় কাপড়ে ছেয়ে যায় বিপণীবিতানগুলো। আসে পাকিস্তানি কাপড়ও। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিয়ালের কিছু চরিত্রের পরিধেয় পোশাক যেন এখন হালফ্যাশন। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য হয় এসব উৎসবে। গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় পোশাকের আগ্রাসনে কোনঠাসা আমাদের নিজস্ব পোশাক।

 

ঈদ যতই এগিয়ে আসছে ভিড় বাড়ছে রাজধানীর শপিংমলগুলোতে। এরই মধ্যে রাজধানীর সব স্তরের মার্কেট থেকে শুরু করে বিভাগ-জেলা-উপজেলা পর্যায়ের মার্কেটগুলোও ছেয়ে গেছে বাহারি নামের ভারতীয় পোশাকে। বৈধ-অবৈধ পথে আসা এসব পোশাক বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। এটা যেন দেখার কেউ নেই।

 

বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, গত কয়েক বছর ধরেই ঈদ উপলক্ষে বিক্রি হওয়া ভারতীয় থ্রি-পিসগুলোর সব অদ্ভুত নামকরণ করা হচ্ছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে বিভিন্ন ভারতীয় চলচ্চিত্রের নাম, গানের নাম, কিংবা বলিউডের নায়িকা ও সিরিয়ালের নায়িকাদের নামানুসারে পোশাকের নাম দেওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

 

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, ভারতীয় সিরিয়ালের নায়িকাদের নামে বাজারে ছাড়া পোশাকগুলো বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব জামা যে ভারতীয় আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের কুফল এটা অস্বীকার যাবে না।

 

আকাশ সংস্কৃতির নামে ভারতীয় টিভির সিরিয়াল, কার্টুন ও হিন্দি চলচ্চিত্রের দিকে শিশু-তরুণ-তরুণীদের ঝুঁকে পড়ায় যেমন সবার অলক্ষেই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি উপেক্ষিত হচ্ছে, তেমনি পোশাকের ক্ষেত্রেও পছন্দের শীর্ষে থাকছে ভারতীয় জামা। এবার ঈদের অন্যতম আকর্ষণ ‘কিরণমালা’ জামা। গত ঈদুল ফিতরে ছিল ‘বোঝে না সে বোঝে না’ সিরিয়ালের নায়িকা নামকরণে ‘পাখি’ জামা, তার আগের বছর ছিল ‘সানি লিওন’ জামা। প্রতি বছর এই চক্রে আবদ্ধ থাকছে দেশের সিংহভাগ কিশোরী-তরুণী।

 

কিন্তু ঈদ উপলক্ষে বিক্রি হওয়া নতুন পোশাকও যে দুঃখের কারণ হতে পারে এমন নজির দেখা গেছে গত বছর। গত ঈদ বাজারে ‘পাখি’ থ্রি-পিস কিনতে দেশব্যাপী মরিয়া হয়ে ওঠে শিশু থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী নারীরাও। ওই জামা কেনার বায়না পূরণের জন্য অভিভাবকদের সঙ্গে শুধু তর্কে জড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি কিশোরী ও তরুণীরা। আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। হয়েছে বিবাহবিচ্ছেদ।

 

ঈদ উপলক্ষে কিরণমালা, জলপরি, রাই কিশোরী নামের রংবেরংয়ের জামা কিংবা মুম্বাইয়ের নায়িকাদের নামে বিভিন্ন রকমের পোশাক নিয়ে বাংলাদেশে আসবেন ভারতের ব্যবসায়ীরা। ঈদের বাজারে তারা শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করে দেশে ফিরে যাবেন। ঈদকে কেন্দ্র করে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিপুল অর্থ নিয়ে যাওয়ার হিসেব কোথাও থাকবে না।

 

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এবারও ঈদের অন্তত দেড় সপ্তাহ আগেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। কিরণমালা জামার জন্য আত্মহত্যা করেছে বগুড়ার এক স্কুলছাত্রী। এটি অবশ্যই আমাদের জন্য উৎকণ্ঠার ও লজ্জার বিষয়। একই সঙ্গে অধিক গুরুত্ব সহকারে ভাবারও বিষয় এটি।

 

আমাদের রয়েছে গর্ব করার মতো হাজার বছরের সংস্কৃতি। কিন্তু ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতিকে কোনঠাসা করছে সুকৌশলে। অথচ ঐতিহ্য রক্ষায় দায়িত্বশীলরা উদাসীন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে না পারলে একদিকে যেমন হারিয়ে যাবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতি, তেমনি আমরাও থাকব পিছিয়ে।

 

একটি অঞ্চলের মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদিকে আমরা সংস্কৃতি বলি। কোনো একটি জাতি বা গোষ্ঠীকে জানতে হলে তার সংস্কৃতির দিকে তাকালেই সব পরিস্কার হয়ে যায়। আমরা বাংলাদেশি। আমাদের নিজস্ব একটি ভাষা আছে। আছে গর্ব করার মতো হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। আমাদের সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, নাট্য, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি এতই সমৃদ্ধ যে পৃথিবীর অনেক দেশ আমাদের সংস্কৃতির কাছে তুচ্ছ ও নগণ্য।

 

এ দেশের মানুষ সংগ্রাম করে তাদের ভাষার অধিকার আদায় করেছে। আমাদের সাহিত্য ও সংগীতও অনেক সমৃদ্ধ। সামাজিক সম্পর্কের দিক থেকে আমরা পৃথিবীতে একটি উদাহরণ। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশে হিন্দু-মসলিম-বৌদ্ধ-খৃষ্টান এক সঙ্গে বাস করে এবং যে যার ধর্ম পালন করে। সেই সংস্কৃতি আজ বিপর্যস্ত। আমরা নিজেদের সংস্কৃতি থেকে ছিটকে গিয়ে হেলে পড়েছি বিদেশি সংস্কৃতির ওপর। দিনে দিনে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

 

বিদেশি সংস্কৃতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলে যে কুফল হয় তার কিছুটা নমুনা প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনের কবলে দেশীয় সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে। দেশীয় উদ্যোক্তারা কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণ করলেও বিদেশি অনুষ্ঠানের ডোমাডোলে তা ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য পাচ্ছে না। কাজেই দেশীয় উদ্যোক্তারাও হাল ছেড়ে দিতে শুরু করেছে। অচিরেই যদি বিদেশি সংস্কৃতির মায়াজাল থেকে মুক্তি নিয়ে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা শুরু না হয় তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের শিকড়কে ভুলে যাবে।

 

পার্শ্ববর্তী দেশের সংস্কৃতি দেখে ঈর্ষা করার কিছুই নেই। তারা তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে। আর আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে লালন করতে পারছি না।

 

এখন প্রশ্ন হলো- সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপরীতে আমরা কতটা সচেতন? বিষয়টি উপলব্ধি করার পরই মোকাবিলা ও কর্মকৌশলের প্রশ্ন আসে। কিন্তু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি এখনও রাজনীতিবিদদের মনোযোগ আকর্ষণে করতে পারেনি। এটা জাতির জন্য অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক।

 

সম্পাদকীয়